ইন্টারনেট বা অনলাইন সম্পর্কে যার নুন্যতম ধারণা নাই, সেও আজ জানে যে, Facebook বলে কিছু একটা জিনিস আছে, যার মাধ্যমে অনলাইনে অনেক কিছু করা যায়। Facebook একটি social networking মাধ্যম যার মাধ্যমে মানুষ পৃথিবীর সেখানেই থাকুক না কেন একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে পারে । আরও অনেক social networking মাধ্যম আছে যেমন twitter, linkedin, instagram, whatsapp, pinterest, youtube ও আরো অনেক। কিন্তু Facebook হল বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় social networking মাধ্যম।
ফেসবুকের ব্যবহারটা বিভিন্ন জন বিভিন্ন সাপেক্ষে দেখে কারন আপেক্ষিকতা। ২০১০ এর দিকে অনেক অফিসে Facebook ব্যবহার করা নিষিদ্ধ ছিলো আর এখন শুধু ফেইসবুক নিয়ে কাজ করে এরকম শ শ অফিস হইছে। এখন বেশিরভাগ অফিসেরই ফেইসবুক পেইজ থাকে। আবার চাকরির জন্য সিভি দিলে সেখনে ফেইসবুক এর প্রোফাইল লিংক দিতে হয়। তবে এখনও কিছু লোক ফেসবুক ব্যবহার করে না এবং ফেসবুক ব্যবহার করাকে ভালো চোখে দেখে না। তাদের না দেখার যথেষ্ট আপেক্ষিকতা আছে। Facebook অনেক ভালো দিক থাকা সত্তেও এর ব্যবহারে অনেক খারাপ দিকও আছে।
কিভাবে Facebook কে ব্যবহার করলে তার খারাপ বিষয় গুলো থেকে বেচে থেকে উপকার পাওয়া যায় সেই আপেক্ষিকতা নিয়ে কিছু কথা।
প্রথমে Facebook যে দিক গুলো খারাপ তার মাঝে অন্যতম কয়েকটি হলো ।
১. জাল/ফেইকঃ
ফেইক ID, ফেইক নিউজ,ফেইক পোস্ট বা কমেন্টের জন্য অনেক সময় অনেক প্রবলেম হয় আর ফেইক নিউজ থেকে অনেক সময় বড় কোন সমস্যার সৃষ্টি হয় যা ইতিপূর্বে আমাদের দেশে হতে দেখা গেছে। সাধারণ জনগণ এই সমস্ত ফেইক জিনিস সহজে বুঝে না। আর না বুঝার ধরুন শেয়ার করে, আবার সেই অনুযায়ী কমেন্ট করে আর এতে আস্তে আস্তে নিজেদের মাঝে বিভক্তি হয়ে তর্কে ঝরিয়ে পরে। তখন ফেইসবুক অনলাইন জগৎ থেকে বেরিয়ে এর প্রভাব বাস্তবেও চলে আসে। যার ফলে মারামারি, কাটাকাটি এমন কি খুন খারাপিও হয়। ফেইক আইডি এবং ফেইক নিউজ বা পোস্ট হল ফেইসবুকের বড় একটা খারাপ দিক।
২. আসক্ত হওয়াঃ
ফেইসবুক এখন একটা নেশায় পরিনত হয়েছে। আমরা এখন কোথাও গেলে বা কোন প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করলে ফেইসবুকে আপলোড দেওয়ার জন্যই ছবি তুলি। ড্রইংরুম থেকে পাকঘরে বা ড্রেসিং রুম থেকে বেড রুমে, বাম থেকে ডানে বা ডান থেকে বামে হলেই সেলফি তুলতেই হবে আর ফেইসবুকে পোস্ট করতেই হবে। পোস্ট করার পর একটু পর পর চেক করি কয়টা লাইক কমেন্ট পরলো। লাইক পাওয়াও এখন একটা আসক্তিতে পরিনত হয়েছে। আবার অনেকেই আছে সারাক্ষন চ্যাটিং নিয়ে ব্যস্ত। তাদের এত কথা যেন দিনে ২৪ ঘন্টা তাদের জন্য কম হয়ে যায়। চ্যাটিং এ এমন নেশা হয়ে যায় যে দিনটা আরও ৩-৪ ঘন্টা বেশি হলে তাদের কথা শেষ করতে পারত। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই নেশাকে এখন একটা রোগ হিসেবে ধরা হয়।
৩. সময় নষ্ট করাঃ
ফেইসবুক ব্যবহার করাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল এতে আমাদের অনেক সময় নষ্ট হয়। একবার ফেইসবুকে টুকে স্ক্রলিং শুরু করলে অনেক লোভনিও নিউজ, লেখা আর ভিডিও সামনে চলে আসে। প্রত্যেকটিতে একটু করে সময় দিলেও আধা ঘন্টা থেকে এক ঘন্টা নিমিষেই চলে যায়। আবার কিছু ভিডিওতে ট্রাইল বা প্রোমো থাকে এবং মুল ভিডিওর লিংক থাকে। আর সেই লিংকে একবার ঢুকে গেলে সময় যে কিভাবে নষ্ট হয় তা সত্যিই চিন্তার বিষয়। ফেইসবুকের ব্যবহারে সবচেয়ে বড় খারাপ দিক হল এতে প্রচুর সময় নষ্ট হয় এবং বেশিরভাগ মানুষই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
মোটামুটি এগুলোই ফেইসবুকের সবচেয়ে বেশি খারাপ দিক।
কিন্তু বর্তমানে যোগাযোগ, বিনোদন, শিক্ষা, ব্যবসা,রাজনীতি, সামাজিক কর্ম-কান্ড যাই ই বলি না কেন, সবকিছু এখন ফেইসবুক কেন্দ্রিক হয়ে গেছে। এখন ফেইসবুকের প্রয়োজনীতা মানুষের মৌলিক চাহিদার মতো। এখন রাজনৈতিক প্রচার বলি আর ধর্মের নসিয়তের প্রচার বলি, শিক্ষকের গবেষণা বলি আর চিকিৎসকের সেবা বলি, ইলন মাস্কের SpaceX এর বিজ্ঞাপন বলি আর মহল্লার ফুচকা মামা ফুচকার বিজ্ঞাপন বলি, সবকিছুরই প্রথম মাধ্যম ফেইসবুক। তাই ফেইসবুক আমাদের ব্যবহার করতেই হয়।
ফেইসবুক এর কিছু ভালো দিক ও এর সাথে সাথে কিভাবে ফেইসবুক ব্যবহার করলে আমাদের নিজেদের কাজে আসবে তা নিয়ে কিছু কথা।
১. পাশে থাকাঃ
ফেইসবুক একটি ইউনিক আইডেনটিটি এবং ফেইসবুকের মূল কাজটা হলো শেয়ার করা যার প্রথম স্টেপ হলো কানেক্ট হওয়া। এইটা একটা বিশাল মাধ্যম যে আপনি ফেইসবুকের মাধ্যমে আপনার ফ্যামিলি মেম্বার, ক্লাস মেট, কলিগ বা যারা আপনার মেন্টর, সবার সাথে এক ক্লিকেই কানেক্টেড হতে পারেন। আমার স্কুল, কলেজ বা ভার্সিটির অনেক বন্ধু আছে, যাদের সাথে যোগাযোগ ছিল না কিন্তু এখন ফেইসবুক এর কল্যানে তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে।
ফেইসবুক থেকে যোগাযোগ করার এই সুবিধা পেতে কানেক্ট হওয়ার আগে আপনকে প্রথমে দেখতে হবে প্রোফাইল এর নাম, ছবি ঠিক আছে কিনা। যদি ঠিক না থাকে তাহলে প্রথমে রিজেক্ট করবেন। তারপর দেখবেন আপনার পরিচিত, আপনার এলাকার বা আপনার বন্ধুর পরিচিত কিনা। হলে এক্সেপ্ট না হলে রিজেক্ট। এভাবে আপনার ফ্রেইন্ড লিস্ট পরিস্কার থাকলে অনেক ফেইক জিনিস থেকে রক্ষা পাবেন।
২. খবর রাখাঃ
ফেইসবুকে মাধ্যমে আপনার এলাকায় কি হচ্ছে তা খবর রাখতে পারছেন। শুধু এলাকায় নয় সারা বিশ্বে কোথাও কোন ঘটনা ঘটলে মুহুর্তের মধ্যে এই ফেইসবুকের মাধ্যমে আমরা জানতে পারি। নিউজ পেপার থেকে এই সব খবর পাওয়া যাবে কিন্তু এক নিউজ পেপার থেকে সব খবর পাওয়া অসম্ভব। আমরা পৃথিবীর সেখানেই থাকি, যদি এলাকার খবর রাখতে চাই, ফেইসবুকের নিউজ ফিডসই যথেষ্ট। যদি শুধু খবর রাখার মনমানসিকতা নিয়ে নিউজ ফিডস দেখি তাহলে আমদের আর সময় নষ্ট হবে না।
৩. অন্য ভাবে শিখাঃ
অনলাইনে শিখার জন্য অনেক ওয়েবসাইট আছে, উইকিপিডিয়া আছে, সেখানে যখন যাবেন তখন আপনার অনেকটা ক্লাস এর টেক্স বই এর মতো মনে হবে যা কয়েক লাইন পরলে আর মজা থাকবেনা। তা ছাড়া আপনি যে ভাবে চাচ্ছেন সেভাবে কন্টেন না থাকলে তখন আর ভালো লাগবে না। আবার উইকিপিডিয়া বা টিউটুরিয়াল সাইট গুলো থিউরি বেইসড কনটেন্ট বেশি থাকে যা আমাদের ভালো লাগে না কিন্তু ফেইসবুকে অনেক বাস্তবমুখি আর্টিকেল, পোস্ট বা শেয়ার হয়। যখন দেখি পরিচিত কেউ পোস্ট করছে তখন তার প্রতি আগ্রহ বেশি থাকে এবং ফেইসবুক থেকে অন্য ভাবে শিখতে পারি।
৪. অন্যের মাঝে নিজেকে দেখাঃ
এই পয়েন্টি হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সারা বিশ্বে কে কি করছে, কি ভাবে করছে, কারা কারা সফল হচ্ছে সব ফেইসবুকে পাওয়া যায়। একজন কাজ করে সফল হয়ে ফেইসবুকে যখন শেয়ার করে তখন আমরা চিন্তা করি সে পারলে আমরা পারবোনা কেন? এইভাবে আমরা একজনকে দেখে নিজেকে ঐ সফলতার মাঝে খুজি আর নিজে নিজে মোটিভেটেট হই।
৫. প্রকৃত মানুষ হওয়াঃ
আমি বিশ্বাস করি যারা নিয়মিত ফেইসবুক ব্যবহার করে, ফেইসবুকে পোস্ট দেয় তাদের কিছু বাদে বেশি ভাগই ভালো ও জ্ঞানী মানুষ। ভালো মানুষ না হলে ভালো চিন্তা মাথায় আসে না । আর ভালো চিন্তা না আসলে ভালো পোস্ট ও লিখা যায় না। ফেইসবুকটা হল একটা সমাজের মত যেখানে একজন মানুষ নিজকে ভালো বললেই ভালো হয়ে যায় না যদি না সমাজের বেশির ভাগ মানুষ ভালো না বলে। ফেইসবুকে একজনের পোস্ট, লাইক ও কমেন্ট দেখেই ঐ মানুষের চিন্তা চেতনা সম্পর্কে ধারণা করা যায়। যারা সমাজে ভালো তারা ফেইসবুকেও ভালো। তাই ফেইসবুকে অন্যকে দেখে ভালো মানুষ বা ভালো মানুষ হতে অনুপ্রাণিত হওয়া যায়।
এই ৫ টি পয়েন্ট যদি আমাদের মাথায় থাকে তাহলে ফেইসবুক ব্যবহার করলে আসক্ত বা সময় নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে।
আর স্যোসাল মিডিয়া ব্যবহার করার সময় মাথায় দুইটি প্রশ্ন ১। "আমার কি লাভ?" ২। “উৎসের নির্ভরযোগ্যতা কতটা” রাখলে আমার মনে হয় আর সময় নষ্ট হবে না।
যেমন ফেইসবুক ফিডে একটা নিউজ ফিড আসলো যার শিরোনামঃ “পপি আর শাকিব খানের আবার বিয়ে করছে”। এখন এখানে ক্লিক করে কিভাবে বিয়ে হল এর বিস্তারিত পড়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করো: পপি আর শাকিব খানের আবার বিয়ের বিস্তারিত জেনে আমার কি লাভ? যদি লাভ না থাকে তাহলে ক্লিক করবো না। তারপরও যদি মনে করি নিউজটা জানলে আমার লাভ হবে তাহলে এর “উৎসের নির্ভরযোগ্যতা কতটা” এইটা দেখতে হবে। এইটি দেশের কোন নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে আসা নাকি আউল ফাউল উৎস থেকে আসা নিউজ তা নিউজফিডের শিরোনাম এর নিচে অয়েবসাইট অ্যাড্রেস দেখা বুঝা যায়। এই দুইটি বিষয় মাথায় রাখলে বাজে কোন বিষয় নিয়ে সময় নষ্ট হবে না।
সবশেষে ফেইসবুক বা স্যোসাল মিডিয়া হল ছুরির মতো। আপনি চাইলে সেটা ভালো কাজে ব্যবহার করতে পারেন আবার চাইলে খারাপ কাজেও ব্যবহার করতে পারেন। কারো মাথায় ফেইসবুক ব্যবহারের সময় "আমার কি লাভ?" এবং খবরের “উৎসের নির্ভরযোগ্যতা কতটা" এই দুইটা জিনিস থাকলে, আসা করা যায়, তার ফেইসবুকের ব্যবহার ভালো কাজেই হবে।

নিজের অবস্থান যাচাই করুন

৫ মিনিটের ফ্রি অ্যাসেসমেন্ট নিয়ে জেনে নিন আপনি এখন কোথায় আছেন, পরের ধাপ কী।

অ্যাসেসমেন্ট নিন