প্রতিদিন ৮৬,৪০০ সেকেন্ডের মহামূল্যবান উপহার —যা একবার গেলে আর ফেরে আসে না।
প্রতিদিন আমাদের প্রত্যেককে দেওয়া হয় ৮৬,৪০০টি সেকেন্ড।
এগুলো কোনো সাধারণ সেকেন্ড নয়—
কারণ একটি সেকেন্ড একবার চলে গেলে,
তা আর কখনো ফিরে আসে না।
— অটোফাই সাইদুল
ধরুন, প্রতিদিন সকালে একটা ব্যাংক আপনার একাউন্টে ৮৬,৪০০ টাকা দেয়।
কিন্তু শর্ত আছে — সকাল ৬টার পর যা অবশিষ্ট থাকবে, সব মুছে যাবে। ৬টার পর আবার নতুন করে ৮৬,৪০০ টাকা আসবে।
আপনি বা আমি কি সেই টাকা নষ্ট করতাম?
অবশ্যই না। প্রতিটা টাকা খরচ করতাম সবচেয়ে দরকারি কাজে।

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠলে একটা অদৃশ্য উপহার আমাদের সবার কাছে আসে।
সেটা প্রতিদিন আসে।
ধনী হোক বা গরিব। রাজা হোক বা রিকশাচালক।
সবার কাছে আসে।
কারো না কম, না বেশি, সবার কাছে ঠিক একই পরিমাণে আসে।
সেই উপহারের নাম — ৮৬,৪০০টি সেকেন্ড।
অর্থাৎ আমাদের নতুন আরেকটা দিন।
২৪ ঘণ্টা মানে ১,৪৪০ মিনিট।
আর ১,৪৪০ মিনিট মানে ৮৬,৪০০ সেকেন্ড।
এই সময় আমরা দেখতে পাই না আর সেটা পাই আমরা সম্পুর্ন বিনামূল্যে।
১১/১১/১১ (২০১১) এই দিনটাকে অনেকে খুব ইউনিক বলে মনে করেন।
আমরা এইটা অনুভব করি না যে আমাদের প্রতিটা সেকেন্ডই ইউনিক।
কারণ আজ ৮৬,৪০০টি সেকেন্ড থেকে একটা সেকেন্ড চলে যাওয়ার পর কেউ আর সেই সেকেন্ডটি ফিরে আনতে পারি না।
কোনো ব্যাংকে জমানো যায় না। কোনো গুদামে রাখা যায় না। কারো থেকে ধার নেওয়া যায় না।
আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতাদের একজন বেঞ্জামিন ফ্র্যাংকলিন বলেছিলেন:
"Lost time is never found again."
"হারানো সময় আর কখনো ফিরে পাওয়া যায় না।"
— বেঞ্জামিন ফ্র্যাংকলিন
মানুষটা ছিলেন লেখক, বিজ্ঞানী, কূটনীতিক — একসাথে। কীভাবে পারলেন?
কারণ তিনি প্রতিটা ঘণ্টাকে হিসাব করতেন।
বিখ্যাত দার্শনিক সেনেকা বলেছিলেন —
"সব কিছুই পরের, শুধু সময়টুকুই আমাদের।"
— লুসিয়াস আনায়াস সেনেকা
সেনেকা আরও বলতেন — মানুষ জীবনের অভাবে মরে না। মানুষ মরে জীবনকে নষ্ট করে করে।
এটা পড়লে বুকে একটু লাগে, তাই না?
অনেকে বলে — "সময় মানে টাকা।"
কিন্তু এই তুলনাটা আসলে ঠিক না, কিছুটা ঠিক হলেও অসম্পূর্ণ।
টাকা হারালে আবার উপার্জন করা যায়। সময় হারালে — আর কোনো উপায় নেই।
টাকা ধার দেওয়া যায়। সময় ধার দেওয়া যায় না।
টাকা জমানো যায়। সময় জমানো যায় না।
টাকা গণনা করা যায়। কিন্তু জীবনের বাকি সময় কেউ জানে না।
তাই সময় টাকার চেয়ে বড়। আসলে সময়ই সবচেয়ে দামি সম্পদ।
তারপরেও মানুষ কেন সময়ের মূল্য বোঝে না?
এর উত্তর আছে মানুষের মনের গভীরে।
আমরা যা দেখতে পাই, তার মূল্য দিই। যা দেখা যায় না — তার মূল্য ভুলে যাই।
সময় দেখা যায় না। হাতে ধরা যায় না। তাই মনে হয় — "আরেকটু পরে করব।"
এই "আরেকটু পরে" — এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর শব্দ।
কারণ সেই "পরে" কখনো আসে না।
অ্যাপলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস একবার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বললেন:
"Your time is limited, so don't waste it living someone else's life." "তোমার সময় সীমিত, তাই অন্য কারো জীবন বাঁচাতে গিয়ে সেটা নষ্ট করো না।" — স্টিভ জবস,
এই কথাটা শুনতে সহজ। কিন্তু বাস্তবে করা অনেক কঠিন।
কারণ আমরা প্রতিদিন অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের সময় বিলিয়ে দিই। আর প্রতিটি সেকেন্ড এর মূল্য ভুলে যাই।
একটা সেকেন্ড কতটা শক্তিশালী? এক সেকেন্ডে কী হতে পারে?
এক সেকেন্ডে একটা "ভালোবাসি" বলা যায়।
এক সেকেন্ডে একটা "মাফ করো" বলা যায়।
এক সেকেন্ডে কাউকে ক্ষমা করে দেওয়া যায়।
এক সেকেন্ডে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় যা জীবন বদলে দেয়।
ইতিহাসে অনেক ঘটনা আছে — যেখানে এক সেকেন্ডের সিদ্ধান্ত সব কিছু পাল্টে দিয়েছে।
এক সেকেন্ডে কেউ বাঁচে।
এক সেকেন্ডে কেউ হারায়।
এক সেকেন্ডে কেউ পথ খুঁজে পায়।
তারপরও প্রতিদিন আমাদের কত হাজার সেকেন্ডে নিজেদের অজান্তেই চলে যায়।
ফেসবুকে "একটু দেখি" করতে করতে এক ঘণ্টা।
ইউটিউবে "আরেকটা ভিডিও" করতে করতে দুই ঘণ্টা।
"কাল থেকে শুরু করব" বলতে বলতে একটা বছর।
এভাবেই আমাদের প্রতিদিন ৮৬,৪০০ সেকেন্ড শেষ হয় বছরের পর বছর।
এটা কোনো অনুপ্রেরণামূলক বক্তৃতা নয়।
এটা একটা সহজ প্রশ্ন —
"আজকের ৮৬,৪০০ সেকেন্ড দিয়ে আমি কী করলাম?"
প্রতিদিন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে এই প্রশ্নটা নিজেকে করুন।
সব সেকেন্ড "উৎপাদনশীল" হতে হবে না। বিশ্রামও দরকার। আনন্দও দরকার। প্রিয়জনের সাথে গল্পও দরকার।
কিন্তু জেনেশুনে নষ্ট করা — সেটা নিজের সাথে সবচেয়ে বড় অন্যায়।
৮৬,৪০০ সেকেন্ড মানে — ৮৬,৪০০টি বর্তমান মুহূর্ত।
আর বর্তমান মুহূর্তই সব
বৌদ্ধ দর্শনে একটা কথা আছে —
"বর্তমান মুহূর্তই একমাত্র মুহূর্ত যা আমাদের কাছে আছে, এবং এটাই সব মুহূর্তের দরজা।"
— থিচ নাট হান (ভিয়েতনামি বৌদ্ধ ভিক্ষু ও শান্তিবাদী লেখক)
অতীত নিয়ে ভাবলে —পাবেন বিষণ্নতা।
ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবলে —পাবেন উদ্বেগ।
বর্তমানে থাকলে —পাবেন জীবন।
তাই প্রতিটা মুহূর্তই এক একটা সুযোগ।
আজ রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে একবার জিজ্ঞেস করুন নিজেকে —
"আজকের ৮৬,৪০০ সেকেন্ড কীভাবে কাটালাম?"
যদি উত্তরটা ভালো লাগে — তাহলে আপনি সঠিক পথে আছেন।
আর যদি না লাগে —
তাহলে কাল সকালে আবার ৮৬,৪০০টি সেকেন্ড আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
আগামীকালের সেই ৮৬,৪০০টি সেকেন্ড যেন আজকের মত না হয়।